ঢাকা , রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬ , ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অযত্নে হারাচ্ছে গৌরীপুর লজের ঐতিহ্য

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৩-০৮-২০২৬ ১২:১১:৫৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৩-০৮-২০২৬ ১২:১১:৫৪ অপরাহ্ন
অযত্নে হারাচ্ছে গৌরীপুর লজের ঐতিহ্য ছবি : সংগৃহীত
ময়মনসিংহ নগরীর জুবিলী রোডে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা গৌরীপুর লজ। ভবনটি জমিদারি ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করছে। এখানে রয়েছে শাস্ত্রীয় সংগীতচর্চারও ইতিহাস। স্থাপনাটির স্থাপত্যও অনন্য। তবে বর্তমানে ভবনটি সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের গেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভবনের ভেতরে রয়েছে নিয়মিত রান্নার ব্যবস্থাও। এ নিয়ে ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ব গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ইতিহাসবিদদের তথ্য অনুযায়ী, গৌরীপুর জমিদার পরিবারের সদস্য ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ১৮২৮ সালে গৌরীপুর লজ নির্মাণ করেন। জমিদার পরিবারের অতিথি আপ্যায়ন, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও শাস্ত্রীয় সংগীতচর্চার অন্যতম কেন্দ্র ছিল এটি।

১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ময়মনসিংহের শশী লজের দোতলা ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর শহরে দোতলা পাকা ভবন নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এ কারণে ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী তার জামাতার জন্য দোতলা পাকা বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা পরিবর্তন করেন। পরে চীন থেকে দক্ষ কারিগর ও নির্মাণ বিশেষজ্ঞ আনা হয়। বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) থেকে সংগ্রহ করা হয় উন্নতমানের কাঠ। এসব দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে বিশ্বেশ্বরী দেবী রোডে নির্মাণ করা হয় দৃষ্টিনন্দন কাঠের দোতলা ভবন। পরে এটি ‘গৌরীপুর লজ’ নামে পরিচিত হয়।

কাঠ ও ঢেউটিনে তৈরি ভবনটির স্থাপত্যশৈলী এখনো নজর কাড়ে। রয়েছে কাঠের দেয়াল, দরজা-জানালা, পাথরের মেঝে, মজবুত স্তম্ভ, প্রশস্ত বারান্দা ও নান্দনিক খিলান। চীনা কারিগরদের নির্মাণশৈলীর ছাপও রয়েছে ভবনটিতে। তবে বর্তমানে ভবনটি অযত্ন ও অবহেলার চিহ্ন স্পষ্ট। বিভিন্ন সময়ে সামনে দীর্ঘ রাজনৈতিক ব্যানার টানানো হয়েছে। এতে ভবনটির সৌন্দর্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভবনটিতে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের শাখা চালু হয়। স্বাধীনতার পর এটি সোনালী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে আসে। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত এখানে ব্যাংকের কার্যক্রম চলে। পরে নতুন ভবনে শাখা স্থানান্তর করা হলে ঐতিহাসিক ভবনটি অন্য কাজে ব্যবহৃত হতে থাকে। বর্তমানে গৌরীপুর লজের নিচতলার চারটি কক্ষ গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দোতলার পাঁচটি কাঠের কক্ষ সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের গেস্ট হাউস। প্রয়োজন অনুযায়ী সেখানে রান্নার ব্যবস্থাও করা হয়।

প্রত্নতত্ত্ব অনুরাগী সজল কোরাইশী বলেন, ‘ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের বড় পৃষ্ঠপোষক। তার আমন্ত্রণে ওস্তাদ এনায়েত খান, মোহাম্মদ আলী খান, ওয়াজির খান, হাফিজ আলী খান ও মোহাম্মদ দবির খানসহ অনেক খ্যাতিমান শিল্পী গৌরীপুর লজে সংগীত পরিবেশন করেছেন। তাই ভবনটি সংগীত ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’

মহানগর সুজনের সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, ‘ঐতিহাসিক এ ভবনকে গেস্ট হাউস ও রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহার করা গ্রহণযোগ্য নয়। কাঠের পুরোনো ভবনে নিয়মিত রান্না ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’ গবেষক ও পর্যটকদের জন্য ভবনটি উন্মুক্ত করারও দাবি জানান তিনি।

পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটির ময়মনসিংহ অঞ্চলের সদস্য সচিব ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, গত ৯ জুন গৌরীপুর লজের গেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহার বন্ধ ও সংরক্ষণের দাবিতে সোনালী ব্যাংকের ময়মনসিংহ অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ।

তবে সোনালী ব্যাংকের ময়মনসিংহ অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, গৌরীপুর লজ ব্যাংকের নিজস্ব সম্পত্তি। ব্যাংক ভবনটি সংরক্ষণ করছে। বর্তমানে এটি কর্মকর্তাদের গেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রয়োজন হলে রান্নার ব্যবস্থা করা হয়। এতে ভবনের ক্ষতির আশঙ্কা নেই।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ফিল্ড অফিসার সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘গৌরীপুর লজ এখনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়নি। তবে চলতি বছরের জরিপ প্রতিবেদনে ভবনটিকে অন্তর্ভুক্ত করে অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।’

ইতিহাস ও ঐতিহ্য গবেষক স্বপন ধর বলেন, ভবনটি দ্রুত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এনে সংরক্ষণ ও দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা উচিত। একই ধরনের আরেকটি ভবন ভারতের দার্জিলিংয়েও রয়েছে বলে জানান তিনি। ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, গৌরীপুর লজের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হবে। সংরক্ষণের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ